article

মেরাজ নবীজীবনের যুগান্তকারী অধ্যায়

১৭ জানুয়ারী, ২০২৬, সকাল ০৯:৪১

শায়খ আহমাদুল্লাহ

মেরাজ সীরাতের অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এটি মহান আল্লাহর অসীম কুদরত এবং রাসুল (সা.)-এর মর্যাদার অনন্য নিদর্শন। মেরাজ শব্দের অর্থ ঊর্ধ্বগমন। নবীজি (সা.) মহান আল্লাহর আমন্ত্রণে সশরীরে, সজ্ঞানে জাগ্রত অবস্থায় জিবরাইল ও মিকাইল (আ.)–এর সঙ্গে বোরাক নামক বিশেষ বাহনের মাধ্যমে প্রথমে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত সফর করেন। এরপর একে একে সপ্তম আসমান ও সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত যান। সেখান থেকে একাকি আরশে আজিমে পৌঁছে মহান আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করেন এবং জান্নাত ও জাহান্নামের দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় একেই মেরাজ বলা হয়। 

মেরাজ সংঘটিত হয়েছিল এমন এক সময়ে, যখন রাসুল (সা.) তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় অতিক্রম করছিলেন। তার প্রিয় সহধর্মিণী খাদিজা (রা.) ও স্নেহশীল চাচা আবু তালিবের ইন্তেকালের মাধ্যমে তিনি পারিবারিক ও সামাজিক আশ্রয় হারান। তায়েফে ইসলাম প্রচার করতে গিয়ে হন নির্মম নির্যাতনের শিকার। এই সময়কালকে সীরাতকারগণ ‘আমুল হুজন’ শোকের বছর হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ঠিক এই দুঃসহ সময়ে আল্লাহ তার প্রিয় বন্ধুকে সম্মানিত করতে মেরাজের মাধ্যমে নিজের সান্নিধ্যে ডেকে নেন। এটি ছিল কষ্টের পর সান্ত্বনার এক মহান নিদর্শন। 

মেরাজ ঠিক কবে সংঘটিত হয়েছে, এ নিয়ে একাধিক মত পাওয়া যায়। রজব মাসের কথা অনেক ঐতিহাসিক উল্লেখ করলেও নির্দিষ্ট মাস, তারিখ কিংবা বছর সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না। এর কারণ হলো—সাহাবায়ে কেরাম সেই বিষয়গুলোকেই গুরুত্ব দিয়ে সংরক্ষণ করতেন, যেগুলোর সঙ্গে সরাসরি শরিয়তের কোনো আমল বা বিধান জড়িত। যেহেতু মেরাজের নির্দিষ্ট তারিখকে কেন্দ্র করে কোনো ফরজ বা সুন্নত আমল নির্ধারিত হয়নি, তাই তারিখ সংরক্ষণ তাদের কাছে মুখ্য ছিল না।

নবীজি (সা.) এই সফরে অনেক অলৌকিক দৃশ্য অবলোকন করেছেন, যা মানবজাতিকে আন্দোলিত করে। তিনি সেখানে জিবরাঈল (আ.)-কে তার আসল আকৃতিতে ৬০০ ডানা বিশিষ্ট অবস্থায় দেখেছিলেন, যার একেকটি ডানা দিগন্ত বিস্তৃত (বুখারি, ৩২৩২)। প্রতিটি আসমানে তিনি বড় বড় নবীদের সাথে কুশল বিনিময় করেন। প্রথম আকাশে আদম (আ.), দ্বিতীয় আকাশে ঈসা (আ.), তৃতীয় আকাশে ইউসুফ (আ.), চতুর্থ আকাশে ইদ্রিস (আ.), পঞ্চম আকাশে হারুন (আ.), ষষ্ঠ আকাশে মুসা (আ.) এবং সপ্তম আকাশে ইব্রাহিম (আ.)-এর সাথে তার সাক্ষাৎ ঘটে। 

এই রাতে নবীজি (সা.) জান্নাত-জাহান্নাম পরিদর্শন করেন। জাহান্নামের শাস্তি এত বিভীষিকাময় যে, যা থেকে বাঁচার জন্য তিনি উম্মতকে বারবার সতর্ক করেছেন। তিনি দেখেছিলেন, একদল মানুষের নখগুলো পিতলের মতো ধারালো, যা দিয়ে তারা নিজেদের মুখ ও বুক ছিঁড়ে রক্তাক্ত করছে। জিবরাঈল (আ.) জানালেন, এরা হলো সেই লোক যারা দুনিয়াতে গীবত করত এবং মানুষের সম্মানহানি করত (আবু দাউদ, ৪৮৭৮)। তিনি আরো দেখলেন, একদল বক্তার ঠোঁট আগুনের কাঁচি দিয়ে কাটা হচ্ছে, কারণ তারা মানুষকে নসিহত করত কিন্তু নিজেরা আমল করত না (মুসনাদে আহমদ, ১২২১১)। রক্তের সমুদ্রে হাবুডুবু খাওয়া সুদখোরদের যন্ত্রণাদায়ক দৃশ্যও তিনি প্রত্যক্ষ করেন (বুখারি ১৯৭৯)। এই দৃশ্যগুলো বর্ণনা করতে গিয়ে ব্যথিত হৃদয়ে নবীজি (সা.) বলেছিলেন, ‘আমি যা দেখি তোমরা তা দেখো না; আমি যা শুনি তোমরা তা শোনো না। আমি যা দেখেছি তা যদি তোমরা দেখতে, তবে তোমাদের জীবন থেকে হাসি-আনন্দ মুছে যেত, তোমরা দুনিয়ার ভোগ-বিলাস ভুলে নির্জনে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করতে (তিরমিজি, ২৩১২)।’

এই সফরে মহান আল্লাহ নবীজি (সা.)-কে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত উপহার দিয়েছেন। শুরুতে ৫০ ওয়াক্ত সালাতের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু উম্মতের দুর্বলতার কথা বিবেচনা করে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত নির্ধারিত হয়। তবে মহান আল্লাহ বলেছেন—কেউ যদি নিষ্ঠার সাথে এই ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে, তাকে ৫০ ওয়াক্তেরই সওয়াবই দেওয়া হবে (বুখারি, ৩৪৯)। নামাজের এই বিধানটি অন্য কোনো বিধানের মতো জিবরাঈলের মাধ্যমে দুনিয়াতে পাঠানো হয়নি, বরং এটি দেওয়ার জন্য নবীজিকে আসমানে ডেকে নেওয়া হয়েছিল। এ থেকেই বোঝা যায় ইসলামের স্তম্ভ হিসেবে নামাজের গুরুত্ব কতটা অপরিসীম। 

ঈমানদারের জীবনে কখনো নামাজ ছুটে যেতে পারে না। যুদ্ধক্ষেত্রে, বিমানে, জাহাজে কিংবা রোগশয্যায়—এমনকি দাঁড়িয়ে পড়তে না পারলে বসে বা শুয়ে হলেও নামাজ পড়ার কঠোর নির্দেশ রয়েছে। হাদিসে এসেছে, কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম নামাজের হিসাব নেওয়া হবে (তিরমিজি, ৪১৩)।  

মেরাজের ঘটনা থেকে আমরা অনেক শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি। প্রথমত, মেরাজ আমাদের শেখায় যে—কঠিন পরীক্ষার পরেই আসে আল্লাহর পক্ষ থেকে সম্মান ও স্বস্তির অবারিত ধারা। নবীজি (সা.) তার জীবনের সবচেয়ে দুঃসহ সময় অতিক্রম করার পরই মেরাজের মতো অতুলনীয় মর্যাদায় ভূষিত হয়েছিলেন। দ্বিতীয়ত, ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ নামাজের বিশেষ গুরুত্ব। তৃতীয়ত, পরকালীন ভয়াবহ শাস্তি থেকে বাঁচতে গীবত, সুদ ও দ্বিমুখী আচরণের মতো সামাজিক ব্যাধি থেকে দূরে থাকা এবং জান্নাতের ব্যাপারে আগ্রহী হওয়া। 

মেরাজ হলো আল্লাহ ও তার রাসুলের প্রতি নিঃশর্ত বিশ্বাসের এক পরীক্ষা। আবু বকর (রা.) কোনো প্রকার যুক্তি-তর্ক ছাড়াই এই অলৌকিক ঘটনাকে সত্য হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন বলে তিনি ‘সিদ্দিক’ উপাধিতে ভূষিত হন। আমাদের জীবনেও ইসলামের প্রতিটি বিধানের প্রতি এমন অটল ও দৃঢ় বিশ্বাসই হোক মেরাজের প্রকৃত শিক্ষা।


জুমার মিম্বর থেকে গ্রন্থনা : নুরুল ইসলাম তানঈম

সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন