article

যেভাবে কাটাবেন ঘুমের আগের সময়

১০ অক্টোবর, ২০২৬, দুপুর ১১:০০

শায়খ আহমাদুল্লাহ

ঘুমের আগের সময়টুকু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দিনের কর্মব্যস্ততা ও প্রতিকূলতা অনেক সময় হৃদয়কে উদাসীন ও আল্লাহবিমুখ করে তোলে। তাই ঘুমানোর আগের এ সময়টুকু হৃদয়কে আল্লাহমুখী করার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সময়। আর দিনের শেষ মুহূর্তগুলো যদি আল্লাহর স্মরণ, দোয়া, জিকির ও তিলাওয়াতে কাটে, তাহলে ঘুমের মধ্যেও একজন মুমিনের হৃদয় আল্লাহর স্মরণে সিক্ত থাকে এবং সর্বপ্রকার ক্ষতি ও শয়তানের অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকে। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ সময়ে সবচেয়ে বেশি আল্লাহর স্মরণ ও ইবাদত করতেন।


দুঃখের বিষয় হলো, ঘুমের আগের আমলের ব্যাপারে আমরা অধিকাংশই চরম উদাসীন। এর অন্যতম কারণ মাত্রাতিরিক্ত মোবাইল ফোনের ব্যবহার। বর্তমান সময়ে ঘুমের আগ পর্যন্ত বেশির ভাগ মানুষের চোখের সামনে ধরা থাকে মোবাইল ফোন। অনর্থক মোবাইল স্ক্রলিং ও চোখের গুনাহ করতে করতে আমরা প্রতিদিন পঙ্কিল হৃদয় নিয়ে ঘুমাই। অথচ এ সময়টি হৃদয়কে পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত করার সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।


মাত্রাতিরিক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহারের কারণে শুধু আমাদের ঈমান-আমলই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা নয়, আমাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাড়ছে দাম্পত্য কলহও। তাই দুনিয়া ও আখেরাতের সীমাহীন কল্যাণ লাভের পাশাপাশি জাগতিক ক্ষতি থেকে রক্ষা পেতে ঘুমানোর বেশ আগেই মোবাইল ফোন দূরে সরিয়ে রাখা এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘুমের আগের ইবাদতের প্রতি অধিক যত্নশীল হওয়া জরুরি।


কুরআনে ঘুমকে জীবন হরণ বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। হাদিসের ভাষ্যমতে, ঘুম আর মৃত্যু যেন সহোদর। এ কারণে ঘুমানোর আগে নিজেকে পরিশুদ্ধ করে আল্লাহর সামনে সমর্পণ করা মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর জিকির ছাড়া ঘুমাতে যাবে, সেটা কেয়ামতের দিন তার বঞ্চনা ও আফসোসের কারণ হবে।’ (আবু দাউদ)।


রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাতে শোয়ার আগে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমল করতেন। রাতের এ সময়টি ছিল তার আল্লাহর স্মরণ, দোয়া, জিকির ও তিলাওয়াতের সময়। এমনকি সকাল-সন্ধ্যা বা অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় রাতের ইবাদতের প্রতি তার বিশেষ যত্ন ছিল। তিনি উম্মতকেও রাতের এ মূল্যবান সময়কে অবহেলায় নষ্ট না করে আল্লাহর স্মরণে কাটানোর প্রতি উৎসাহিত করেছেন। 


এক হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রাতে ১০ আয়াত তিলাওয়াত করে নামাজ আদায় করবে, তাকে গাফেলদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে না। আর যে ব্যক্তি ১০০ আয়াত তিলাওয়াত করে নামাজ আদায় করবে, তাকে অনুগত বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। আর যে ব্যক্তি ১ হাজার আয়াত তিলাওয়াত করে নামাজ আদায় করবে, তাকে বিপুল সওয়াবের অধিকারীদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে (আবু দাউদ)।’ 


অবশ্য রাতের ইবাদত বলতে আমরা বেশির ভাগই শেষ রাতের তাহাজ্জুদ এবং দোয়াকেই বুঝে থাকি। অথচ সকাল-সন্ধ্যার মতো ঘুমানোর আগেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিয়মিত অনেক আমল করতেন। যা সুরক্ষা, ক্ষমা, তওবা, নাজাত ও আত্মোপলব্ধির জন্য বড় সহায়ক ও গুরুত্বপূর্ণ।


কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘুমানোর আগের আমলবিষয়ক বাংলা ভাষায় কোনো সংকলন আমাদের চোখে পড়েনি, যা অনুসরণ করে সাধারণ মানুষ সহজেই আমলগুলো করতে পারবেন। শুধু বাংলায় নয়, উর্দু ও আরবিতেও এ বিষয়ে স্বতন্ত্র সংকলন খুব একটা চোখে পড়েনি। যা আছে, সেগুলো মূলত বড় কোনো বইয়ের অধ্যায় বা অংশবিশেষ। 


সাধারণ মানুষের আমলের সুবিধার্থে আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন থেকে সম্প্রতি  প্রকাশিত হয়েছে ‘প্রিয় নবী (সা.)-এর ঘুমানোর আগের দুআ-যিকির ও আমল’ পুস্তিকাটি। এতে প্রিয় সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘুমানোর আগের দুআ-জিকির ও আমলগুলো একত্র করা হয়েছে। পুস্তিকাটি সুন্নাহসম্মতভাবে রাত যাপনে সহায়ক হতে পারে, ইনশাআল্লাহ।

 

সর্বোপরি কথা হলো, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহতেই মূলত আমাদের ইহকালীন ও পরকালীন মুক্তি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে আমল করেছেন এবং করতে বলেছেন—চাই তা দিনে হোক বা রাতে—সেই সুন্নাহসমূহ চর্চার মাঝেই রয়েছে প্রভূত কল্যাণ। আর সেটিই নাজাত ও সার্বিক সুরক্ষার পরীক্ষিত পথ।

 

জুমার মিম্বর থেকে গ্রন্থনা : নুরুল ইসলাম তানঈম

সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন