শিশুর আগামী নির্মাণের নেপথ্যে যে দায়
৩০ অক্টোবর, ২০২৬, দুপুর ১২:৩৩
শায়খ আহমাদুল্লাহ
শিশুরা আগামীর পৃথিবী। তাদের সঠিকভাবে গড়ে তোলার মধ্যেই নিহিত একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা। আর এই ভবিষ্যৎ নির্মাণের কারিগর হলেন শিক্ষকগণ। একজন শিক্ষকের হাতেই মূলত রচিত হয় আগামীর পৃথিবী। আগামী দিনের পৃথিবী ও সমাজব্যবস্থা কেমন হবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করে আজকের শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষকের ওপর। তাই একজন শিক্ষককে হতে হবে অত্যন্ত সৎ, আমানতদার ও দায়িত্বশীল। একই সঙ্গে তাকে হতে হবে শিশুর নির্ভরতার জায়গা, নিরাপদ আশ্রয়।
একটি কচি চারাগাছ যেভাবে আলো, বাতাস ও মালির পরম যত্নে ধীরে ধীরে বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়, তেমনই একজন মানবশিশুর সুপ্ত সম্ভাবনাও বিকশিত হয় শিক্ষক নামক মালির সযত্ন পরিচর্যা ও নিবিড় তত্ত্বাবধানে। এ জন্য শিক্ষককে যেমন আদর্শবান হতে হবে, তেমনই শিশুর জন্য নিশ্চিত করতে হবে ভয়হীন, নিরাপদ ও আনন্দময় শিক্ষাঙ্গন। কারণ শিশুরা দিনের যতটা সময় পরিবারের কাছে থাকে, তার চেয়ে বেশি সময় থাকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। ফলে একটি শিশুর মনোজগৎ, চিন্তাচেতনা ও ভবিষ্যৎ নির্মাণে শিক্ষক ও শিক্ষাঙ্গনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, বর্তমান প্রায়শই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের নানা অসংলগ্ন আচরণ ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের খবর আমাদের সামনে আসছে, যা আমাদের রীতিমতো শঙ্কিত করে তুলছে। উদ্বিগ্ন করে তুলছে অভিভাবকদেরও। শিক্ষক যখন নীতিভ্রষ্ট হন, তখন তার বিষাক্ত প্রভাব কেবল একটি শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা গোটা প্রজন্মকে কলুষিত করে। এটি নিঃসন্দেহে সমাজের জন্য অশনিসংকেত। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হতে হবে এমন নিরাপদ আশ্রয়স্থল, যেখানে প্রবেশমাত্রই শিশু নিরাপত্তা ও নির্ভরতা পাবে। এর জন্য সরকার ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্তৃপক্ষের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার কোনো বিকল্প নেই।
শিশুরা আমাদের আমানত। আমানতের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও নৈতিক সুরক্ষার নির্দেশ ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, তোমরা আমানত তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দেবে।’ (সুরা নিসা, ৫৮)। শিশুদের শিক্ষা, প্রতিপালন ও নিরাপত্তার দায়িত্ব যাদের ওপর অর্পিত, তাদের জন্য এ নির্দেশনা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। অন্য আরেক হাদিসে প্রিয়নবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সহিহ বুখারি, ৭১৩৮)।
শিক্ষকতা নিছক কোনো অর্থ উপার্জনের কোনো পেশা নয়, এটি মহাগুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও অমানত। শরীয়তে শিশুরা গায়রে মুকাল্লাফ তথা দায়ভার ও জবাবদিহিতা থেকে মুক্ত। তারা শারীরিকভাবে যেমন দুর্বল তেমনই মানসিকভাবেও কোমল। তাই তাদের সাথে কোমল ও নরম আচরণ করতে হবে। তাদেরকে শিক্ষাদান করতে হবে মায়ের মতো স্নেহ-মমতা দিয়ে। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত নবীজি (সা.) বলেছেন, আল্লাহ আমাকে হঠকারী ও কঠোরতাকারীরূপে প্রেরণ করেননি; বরং সহজ-কোমল আচরণকারী শিক্ষকরূপে প্রেরণ করেছেন। (মুসলিম, ১৪৭৮) সুতরাং শিক্ষককে হতে হবে অত্যন্ত কোমল ও শিশুবান্ধব।
শিশুর মন এক টুকরো শুভ্র কাগজের মতো স্বচ্ছ ও সংবেদনশীল। সেখানে শিক্ষকের আচরণ যে ছাপ রেখে যায়, তা শিশুর জীবন গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে। শিক্ষকের ভালোবাসাপূর্ণ একটি দৃষ্টি শিশুর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। বিপরীতে, সামান্য অবহেলা কিংবা নিষ্ঠুর আচরণ তার আত্মবিশ্বাসে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে, যার প্রভাব দীর্ঘদিন থেকে যেতে পারে। তাই নিরাপদ সমাজ ও সুন্দর আগামীর স্বপ্ন বাস্তবায়নে সবার আগে প্রয়োজন শিক্ষকের হৃদয়ে মমতা ও দায়িত্ববোধের বিকাশ।
মমতাপূর্ণ নীতিবান আদর্শ শিক্ষকের পাশাপাশি প্রয়োজন কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাও। শিক্ষক নিয়োগে সতর্কতা, শিশু সুরক্ষাবিষয়ক প্রশিক্ষণ, সুস্পষ্ট আচরণবিধি, নিরাপদ অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা। কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষার অজুহাতে তা ধামাচাপা দেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে অভিযোগের যথাযথ তদন্ত ও ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অপরাধী শাস্তি পায় এবং নির্দোষ ব্যক্তি অন্যায়ের শিকার না হন। আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা, তদারকি ও অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের ব্যবস্থাও জরুরি।
তবে এ দায়িত্ব কেবল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একার নয়। পরিবারকেও শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যাতে সে ভয় বা সংকোচ ছাড়াই নিজের সমস্যার কথা বলতে পারে। মোটকথা, আমরা যদি চাই, আগামী প্রজন্ম জ্ঞানী, নৈতিক ও মানবিক হয়ে উঠুক, তাহলে শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবার, সুরক্ষিত সমাজ ও দায়িত্বশীল শিক্ষাঙ্গন নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষককে হতে হবে আদর্শের প্রতিচ্ছবি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হতে হবে আস্থার আশ্রয়, আর সমাজ হতে হবে শিশুবান্ধব।
জুমার মিম্বর থেকে গ্রন্থনা : নুরুল ইসলাম তানঈম
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন