রিকশাচালকদের উদ্দেশে খুতবা
১৩ ডিসেম্বর, ২০২৫, দুপুর ০৩:২৭
শায়খ আহমাদুল্লাহ
মহান আল্লাহ মানুষকে সম্মানিত জীব হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। বংশ, গায়ের রং কিংবা অর্থনৈতিক তারতম্যে ইসলাম মানুষের মাঝে ভেদাভেদ রাখেনি। তবে ভেদাভেদ এক জায়গায় রেখেছে। সেটা হলো তাকওয়া। আল্লাহ বলেন, তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সে বেশি সম্মানিত যে অধিক তাকওয়াবান (হুজুরাত)। রসুল (সা.) বিদায় হজের ভাষণে বলেছেন, জেনে রাখো, আরবের ওপর অনারবের এবং অনারবের ওপর আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। ভাষণের শেষাংশে বলেন, শ্রেষ্ঠত্ব কেবল তাকওয়ায়।
অতএব একজন রিকশাচালক অথবা যে কোনো নিম্ন আয়ের মানুষ, তিনি যদি মুত্তাকি হন, তবে তিনি তাকওয়াহীন ধনী মানুষের চেয়ে আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয়। রিকশাচালক ভাইয়েরা অনেক সময় হীনম্মন্যতায় ভোগেন। সমাজ আপনাদের গুরুত্ব দেয় না, তাচ্ছিল্য করে, দুর্ব্যবহার করে; এই হীনম্মন্যতা কাটিয়ে উঠতে হবে। আপনি যদি আল্লাহর প্রিয় হয়ে উঠতে পারেন, তবে পৃথিবীর সব মানুষের তাচ্ছিল্যতেও কিছু আসে যায় না।
আপনারা কঠোর পরিশ্রম করেন। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে জীবিকা উপার্জন করেন। মনে রাখবেন, এই কঠোর কায়িক পরিশ্রম শুধু আপনারাই করছেন না, পৃথিবীর অসংখ্য নবী-রসুল আপনাদের মতো কায়িক শ্রম দিয়েছেন। ইসলামের প্রথম নবী আদম (আ.), তিনি কৃষিকাজ করেছেন। মুসা (আ.) আট থেকে দশ বছর ছাগল চরিয়েছেন। জাকারিয়া (আ.) কাঠমিস্ত্রির কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। আবার রসুল (সা.) বলেছেন, আল্লাহ এমন কোনো নবী পাঠাননি, যিনি ছাগল চরাননি। আমিও কয়েক কিরাতের বিনিময়ে মক্কাবাসীর ছাগল চরাতাম (বোখারি)।
রসুল (সা.) আরও বলেছেন, অন্যান্য ফরজ আদায়ের সঙ্গে হালাল জীবিকার ব্যবস্থা করাও একটি ফরজ। অন্য পেশাজীবীদের চেয়ে রিকশাচালকদের জন্য আল্লাহর প্রিয় হয়ে ওঠার সুযোগ অনেক বেশি। তারা দিনের বেশির ভাগ সময় রাস্তায় থাকেন। রাস্তায় মানুষের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলার, মানুষের উপকার করার সুযোগ বেশি। পথের মাঝে আপনি বিপদগ্রস্ত কাউকে দেখলেন। আপনি তার সাহায্যে এগিয়ে যান। যাত্রীদের সালাম দিন। তাদের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলুন। রিকশায় মাদক ও অন্যান্য অবৈধ জিনিস বহন করবেন না। এটা অন্যায়। অনেক সময় অধিক ভাড়ার প্রলোভনে এ ধরনের অবৈধ কাজের হাতছানি আসবে। কিছু টাকার জন্য নিজের সততাকে জলাঞ্জলি দেওয়া যাবে না।
যুগে যুগে যারাই পৃথিবীর পট পরিবর্তন করেছেন, প্রায় সবাই ছিলেন সাধারণ মানুষ। পৃথিবীতে যত নবী-রসুল গত হয়েছেন, অধিকাংশই ছিলেন দরিদ্র এবং তাঁদের অনুসারীরাও ছিলেন দরিদ্র। এ নিয়ে অবিশ্বাসীরা তাদের ঠাট্টা করতেও ছাড়ত না। এর অসংখ্য নমুনা আমরা সাহাবিদের জীবনে দেখতে পাই। মক্কায় ইসলামের চারা অঙ্কুরিত হলে প্রাথমিক পর্যায়ে যারা দীনের পথে আসেন, বেশির ভাগই ছিলেন দরিদ্র। ইসলাম গ্রহণের কারণে প্রভাবশালী কর্তৃক তাদের শারীরিক এবং মানসিক নিপীড়ন সহ্য করতে হয়েছে। অনেকে জীবন পর্যন্ত দিয়েছেন। তারপরও তারা ইসলাম থেকে বিচ্যুত হননি।
রিকশাচালক ভাইয়েরা অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল জীবন-যাপন করেন। এর খারাপ প্রভাব অনেক সময় পরিবারের ওপর পড়ে। আপনারা স্ত্রী ও সন্তানদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবেন। আমাদের নবীজি (সা.) কখনো স্ত্রীর গায়ে হাত তোলেননি। আপনারাও স্ত্রীর গায়ে হাত তুলবেন না, তুইতোকারি করবেন না। বরং সুযোগ থাকলে ঘরের কাজে তাদের সাহায্য করবেন। অবসর সময় সন্তানের সঙ্গে কাটাবেন। তাদের ভালো মানুষ বানানোর চেষ্টা করবেন। এতে আপনার অভাবের সংসারে জান্নাতি সুখ নেমে আসবে ইনশাআল্লাহ।
আমি ২৫ বছর ধরে জুমার নামাজ পড়াই। কিন্তু ২৫ বছরের ইতিহাসে শুধু রিকশাচালক ভাইদের নিয়ে নামাজ পড়ানো এটাই প্রথম। আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন আপনাদের জীবনমান উন্নয়নে বিশেষ কর্মশালার আয়োজন করেছিল আজ। আপনারা এসেছেন, বিশেষজ্ঞদের কথা শুনেছেন, আশা করছি, আজকের কর্মশালা আপনাদের জীবনমান উন্নয়নে বিরাট ভূমিকা রাখবে।
আপনাদের জন্য জান্নাতে যাওয়া সবচেয়ে সহজ। আপনাদের টাকাপয়সা কম। কেয়ামতের ময়দানে আপনাদের টাকাপয়সার হিসাবও কম হবে। শিরকি বিশ্বাস থেকে বেঁচে থাকবেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়বেন, মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবেন, কারও হক নষ্ট করবেন না, অবৈধ কাজের সঙ্গে জড়াবেন না; আশা করা যায়, এমন অল্প আমলেই সহজে জান্নাতে চলে যেতে পারবেন। আর আপনি যদি জান্নাতের কাজ করে যেতে না পারেন, তবে দুনিয়াতেও আপনার কষ্ট, আর আখেরাতে তো অনন্ত কষ্ট অপেক্ষা করছেই।
জুমার মিম্বর থেকে গ্রন্থনা: সাব্বির জাদিদ
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন