অসৎ ব্যক্তিকে ভোট দেওয়া আমানতের খেয়ানত
৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, দুপুর ১১:২৬
শায়খ আহমাদুল্লাহ
এ দেশে সব সময়ই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা কাজ করে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখেও এর ব্যতিক্রম নয়। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন। কিন্তু একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের প্রতিটি কাজ, প্রতিটি সিদ্ধান্ত হতে হবে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। আমাদের নামাজ, আমাদের কোরবানি, আমাদের জীবন এবং আমাদের মরণ সবই যেমন মহান আল্লাহর জন্য উৎসর্গীকৃত, তেমনি আমাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সিদ্ধান্তটিও আল্লাহর নির্দেশিত জীবনব্যবস্থার বাইরের কোনো বিষয় নয়।
একটি রাষ্ট্রের শাসনভার হলো জনগণের পক্ষ থেকে সবচেয়ে বড় আমানত। আর এই আমানতটি কার হাতে তুলে দেওয়া হবে, সেই সিদ্ধান্তের চাবিকাঠি হলো আপনার একটি ভোট। আপনি যদি জেনে-বুঝে অযোগ্য, অসৎ ও পাপাচারীর হাতে এই আমানত সোপর্দ করেন, তবে আপনি স্পষ্টত আমানতের খেয়ানত করলেন। রসুল (সা.) বলেছেন, যার আমানতদারি নেই, তার ইমান নেই (মুসনাদে আহমাদ)।
তা ছাড়া একজন অসৎ মানুষকে ভোট দেওয়া মানে কার্যত মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান করা। নবী করিম (সা.) মিথ্যা সাক্ষ্যকে সবচেয়ে ভয়াবহ কবিরা গুনাহগুলোর অন্যতম হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। জেনে-বুঝে যদি কেউ অযোগ্য, দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করে, তাহলে সে ব্যক্তি ক্ষমতায় গিয়ে জনজীবনে যে অন্যায়, দুর্নীতি কিংবা মানুষের হক নষ্টের কাজ করবে-তার দায়ের অংশ আনুপাতিক হারে ভোটদাতার ওপরও বর্তানো স্বাভাবিক। কারণ ভোটদাতা তাকে ক্ষমতার আসনে বসাতে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগীর ভূমিকা পালন করেছে।
এ ক্ষেত্রে অনেকাংশে ভোটারদের ভুল সিদ্ধান্ত দায়ী। কোনো প্রার্থী সৎ ও যোগ্য কিন্তু নির্বাচনি মাঠে কম আলোচিত বলে তাকে ভোট দেন না অনেকে। কারণ সে জিতবে না। অথচ কাউকে জেতানো হারানো আপনার দায়িত্ব নয়, আপনার দায়িত্ব হলো সঠিক সাক্ষ্য দেওয়া এবং প্রকৃত প্রাপকের কাছে আমানত পৌঁছে দেওয়া। একজন সৎ মানুষ যদি আপনার একটি ভোট পেয়ে পরাজিতও হন, তবু আল্লাহর কাছে আপনি আমানত রক্ষা করার পুরস্কার পাবেন। কিন্তু আপনি যদি কেবল জেতার সম্ভাবনা বেশি বা বেশি আলোচিত বলে একজন অসৎ মানুষকে ভোট দেন, তবে আপনি কার্যত মন্দের হাতকেই শক্তিশালী করলেন এবং আমানতের খেয়ানতকারী হিসেবে সাব্যস্ত হলেন।
আমাদের দেশে ভোটের এই আমানতকে কলুষিত করার অনেক জঘন্য সংস্কৃতির প্রচলন রয়েছে। তন্মধ্যে সাধারণ মানুষের জীবনধারায় দাপুটে হস্তক্ষেপ ও ভোট কেনাবেচা অন্যতম। অনেক প্রার্থী বিপুল অর্থ খরচ করে মানুষের ভোট কেনেন, আবার অনেক ভোটারও সামান্য জাগতিক স্বার্থের বশবর্তী হয়ে নিজের আমানত বিক্রি করে দেন। ভোট কেনা ও ভোটের বিনিময়ে টাকা নেওয়া ঘুষের অন্তর্ভুক্ত। রসুল (সা.) ঘুষদাতা ও গ্রহীতা উভয়ের ওপর লানত করেছেন (তিরমিজি)। যে প্রার্থী টাকা দিয়ে ভোট কেনেন, তিনি মূলত এটি প্রমাণ করেন যে জনগণের প্রতি তার কোনো দায়বদ্ধতা নেই। নির্বাচিত হয়ে জনসেবার বদলে টাকা উশুলের ধান্ধায় মত্ত হন। এভাবেই সমাজ ও রাষ্ট্রে দুর্নীতির উৎপত্তি ঘটে।
প্রার্থীদের উচিত নিজেদের সৎ প্রমাণ করা এবং সততার সঙ্গে জনসেবার মানসিকতা ধারণ করা। ভোটারদের উচিত সততা, যোগ্যতা দেখে ভোট প্রদান করা। অনেক প্রার্থী নির্বাচনি প্রচারণায় অবলীলায় মিথ্যা প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ছোটান। রসুল (সা.) প্রতারণা ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী সম্পর্কে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, কিয়ামতের দিন প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারীর সঙ্গে তার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের পরিমাপ অনুযায়ী উঁচু পতাকা থাকবে, যাতে তার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের কথা লেখা থাকবে। আর জনগণের সঙ্গে কৃত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারীর চেয়ে বড় প্রতারক ও প্রতিশ্রতি ভঙ্গকারী আর কেউ হতে পারে না। (মুসলিম)
ভালো শাসক কিংবা মন্দ শাসক নির্বাচিত হওয়া মূলত জনগণের কর্মের প্রতিফলন। আল্লাহ বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা নিজেরা পরিবর্তন করে (সুরা রাদ)। আমরা ভোটাররা যদি নিজেরা সৎ না হই এবং আমানত রক্ষা না করি, তবে আমাদের ভাগ্য কখনো সুপ্রসন্ন হবে না। তাই ভোট প্রদানের আগে অন্তত কয়েকবার নিজের বিবেককে প্রশ্ন করুন। জাগতিক স্বার্থ ও সাময়িক উন্মাদনায় গা ভাসাবেন না। যাকে ভোট দিলে দেশের মঙ্গল হবে, সমাজ থেকে দুর্নীতি কমবে এবং ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর স্বার্থ সংরক্ষিত থাকবে, তাকেই বেছে নেওয়া সচেতন মুসলমানের ইমানি দায়িত্ব।
জুমার মিম্বর থেকে গ্রন্থনা : নুরুল ইসলাম তানঈম
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন