পয়লা বৈশাখে ভিন্নধর্মী সংস্কৃতি কাম্য নয়
১১ এপ্রিল, ২০২৬, সকাল ০৯:৪৮
শায়খ আহমাদুল্লাহ
মানুষের জীবন, সমাজ ও সংস্কৃতিতে স্বভাবতই বিভিন্ন উৎসব, আনন্দ ও উদযাপনের উপলক্ষ্য থাকে। ইসলাম মানুষের স্বভাবত আনন্দকে নিষিদ্ধ করে না; বরং তা সুশৃঙ্খল, শালীন এবং আল্লাহভীতির সীমার মধ্যে উদযাপনের কথা বলে। যেমন বাংলার একটি ঐতিহ্যবাহী ফসল উৎসব নবান্ন উৎসব। নতুন ধান ঘরে ওঠার সময় পিঠা, পায়েস ইত্যাদির আয়োজন করা গ্রামীণ ঐতিহ্যের অংশ। এতে বিশ্বাস বা কর্মগত এমন কোনো বিষয় নেই, যা ইসলামের নির্দেশনার সাথে সাংঘর্ষিক। সুতরাং এ ধরনের আয়োজন ইসলামে নিষিদ্ধ নয়। রাসুল (সা.)-এর সময়েও প্রাচীন আরব্য সংস্কৃতির কোনো অনুষঙ্গ ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক না হলে তিনি সেটাকে নিষেধ করতেন না। তবে কোনো উৎসব যখন এমন বিশ্বাস, প্রতীক ও আচারের বাহক হয়ে ওঠে, যা ইসলামি আকিদা ও তাওহিদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক—তখন তা আর কোনো মুসলিমের জন্য স্বভাবত আনন্দের বিষয় থাকে না। বরং তা তার জন্য পরিহার্য বিষয়ে পরিণত হয়।
পয়লা বৈশাখ ও এর ক্রমবিকাশের ইতিহাস অনুসন্ধান করলে আমরা এর তিনটি স্তর পাই। প্রাচীনকালে এটি ছিল মূলত জমিদার আমলের খাজনা আদায়ের দিন। বছর শেষে প্রজাদের থেকে পাওনা মিটিয়ে জমিদারেরা বৈশাখের প্রথম দিনে মিষ্টিমুখ করাতেন। পরবর্তীতে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলে এটি হালখাতার উৎসবে রূপ নেয়। পাড়া-মহল্লা ও গ্রাম-গঞ্জের ব্যবসায়ীরা তাদের বকেয়া আদায়ের উদ্দেশ্যে ক্রেতাদের আমন্ত্রণ জানাতেন এবং মিষ্টিমুখের মাধ্যমে আপ্যায়ন করতেন। এটা ছিল নিছক সামাজিক একটি উৎসব। তখন এটিকে জাতীয়ভাবে উদযাপন করা হতো না।
কিন্তু পয়লা বৈশাখ উদযাপের আধুনিক যে রূপ আমরা দেখছি, তার গোড়াপত্তন হয় ১৯৮৯ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের কিছু শিক্ষক-শিক্ষার্থীর উদ্যোগে। (উইকিপিডিয়া)
প্রথমে এর নাম দেয়া হয়েছিল আনন্দ শোভাযাত্রা। কিছুদিন যেতে না যেতেই এর নাম পরিবর্তন করে দেয়া হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। আয়োজকদের ব্যাখ্যা মতে মঙ্গল শোভাযাত্রার মানে হলো, মঙ্গলের উদ্দেশ্যে শোভাযাত্রা। যেটির সঙ্গে বিশ্বাসের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। সম্প্রতিই এর নাম পরিবর্তন হয়ে আবার আনন্দ শোভাযাত্রা হয়েছিল, এবছর হয়তো বৈশাখী শোভাযাত্রা নামে উদযাপিত হতে পারে। নাম যেটাই হোক মূল আনুষ্ঠানিকতা কিন্তু প্রায় তেমনই। অর্থাৎ একটি বিশেষ ধর্মের বিশ্বাস ও সংস্কৃতি প্রদর্শন।
এই দিন ঢোল-তবলার তালে তালে দেব-দেবীর বাহন ও বিভিন্ন জীবজন্তুর মুখোশ নিয়ে যে র্যালি বের করা হয়, তার মূল উদ্দেশ্য অমঙ্গল দূর করে মঙ্গলের আবাহন করা। বাহ্যিক দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, এসব মূর্তি ও মুখোশ স্রেফ আর্ট ও সৌন্দর্যের জন্য বহন করা হয়। বাস্তবতা হলো, আপনি মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজক, চারুকলা ইনস্টিটিউটের বিভিন্ন শিক্ষকদের নানা সময়ে দেয়া এই সম্পর্কিত বক্তব্যগুলোকে একত্র করলে নিশ্চিত হতে পারবেন যে, এগুলো স্রেফ আর্টের জন্য করা হয় না। তাদের মতানুসারে এ শোভাযাত্রা বের করা হয় দেশের মানুষের সমৃদ্ধি ও কল্যাণের জন্য। অথচ মঙ্গল ও অমঙ্গলের একমাত্র মালিক মহান আল্লাহ। কলকাতার আনন্দ বাজার পত্রিকা ২০১৮ এর ১৫ এপ্রিলের একটি প্রতিবেদন করেছিল, যার শিরোনাম ছিল— ‘ঢাকার পয়লা যেন অষ্টমীর একডালিয়া’।
খ্রিস্টানরা ঈসা (আ.) ও তার মা মারইয়াম (আ.)-কে উপাসনা করে এবং তাদের নিকট কল্যাণ প্রার্থনা করে। মহান আল্লাহ সুরা মায়িদার ১৭ নম্বর আয়াতে এ বিশ্বাসের অসারতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। সেখানে বলা হয়েছে—আল্লাহ যদি মারইয়াম-তনয় ঈসা, তার মাতা এবং সমগ্র বিশ্বের সবাইকে ধ্বংস করতে চান, তবে তাকে প্রতিরোধ করার ক্ষমতা কার আছে? উত্তর সুস্পষ্ট—কেউ নেই। সুতরাং যাদের নিজেদের অস্তিত্বই আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল, তাদের উপাসনা করার কোনো যৌক্তিকতা থাকতে পারে না। যারা নিজেদেরকেই ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম নয়, তারা অন্যদের কীভাবে রক্ষা করবে? অতএব কল্যাণ ও মঙ্গলের একমাত্র মালিক মহান আল্লাহ।
তাছাড়া এ শোভাযাত্রায় ব্যবহৃত প্রতিটি প্রতীকই কোনো না কোনো পৌত্তলিক বিশ্বাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত। উদাহরণস্বরূপ, পেঁচা হলো দেবী লক্ষ্মীর বাহন, ইঁদুর গণেশের বাহন, হাঁস সরস্বতীর এবং সিংহ দুর্গার বাহন। হিন্দুদের বিশ্বাস মতে, এই প্রাণীগুলো মঙ্গল বয়ে আনে। কিন্তু একজন মুসলিমের জন্য এমন বিশ্বাস রাখা সরাসরি শিরকের শামিল। পহেলা বৈশাখ উদযাপনের নামে এমন আরো অনেক কিছু প্রচলিত আছে যা, হিন্দুদের ধর্ম বিশ্বাস এবং ধর্মীয় কৃষ্টির সাথে সামাঞ্জস্যপূর্ণ। নবী কারীম (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো সম্প্রদায়ের সাদৃশ্য ধারণ করবে সে তাদের অন্তর্ভুক্ত বলে বিবেচিত হবে।
সুতরাং হিন্দুরা তাদের ধর্মীয় কৃষ্টি পালন করুক, এটা তাদের বিষয়। কেয়ামতে তারা আল্লাহর সঙ্গে বোঝাপড়া করবে। কিন্তু মুসলিমদের ওপর বাঙালি সংস্কৃতির নামে সুকৌশলে আরোপিত হিন্দু ধর্মের সংস্কৃতি চাপিয়ে দেয়া গ্রহণযোগ্য নয়। আমাদের সকলকে এ বিষয়ে সচেতন ও সতর্ক হতে হবে।
জুমার মিম্বর থেকে গ্রন্থনা : নুরুল ইসলাম তানঈম
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন