কুরবানি আল্লাহ প্রেমের নিদর্শন
২৩ মে, ২০২৬, দুপুর ১০:১২
শায়খ আহমাদুল্লাহ
মানুষের জীবনের প্রকৃত সার্থকতা নিহিত স্রষ্টার আনুগত্য ও ভালোবাসার মাঝে। আর আল্লাহর প্রতি বান্দার ভালোবাসা প্রদর্শনের অন্যতম নিদর্শন কুরবানি। কুরবানি শুধু পশু জবাই নয়; বরং এর মর্ম কথা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের সবচেয়ে প্রিয় বস্তুকে উৎসর্গ করতে প্রস্তুত থাকা। হৃদয়ে কোনো ধরনের দ্বিধা কিংবা সংকোচ না থাকা।
কুরবানির ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা আল্লাহর প্রতি ইবরাহিম (আ.)-এর অকুণ্ঠ ভালোবাসা ও আনুগত্যের এক অনুপম নজির দেখতে পাই। যখন ইবরাহিম (আ.) নিজের পরম আকাঙ্খিত ও ভালোবাসার সন্তানকে আল্লাহর জন্য উৎসর্গ করতে আদিষ্ট হলেন। তিনি বিন্দু পরিমাণ কুণ্ঠাবোধ করেননি। বরং আল্লাহর আদেশ পালনে দৃঢ় চিত্তে এগিয়ে গেলেন। সন্তানও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গিত হতে প্রস্তুত হয়ে গেলেন।
পিতা-পুত্রের এই যে অভূতপূর্ব আত্মত্যাগ, এটিই মূলত ইসলামের শিক্ষা। আল্লাহ দেখতে চেয়েছিলেন ইবরাহিম (আ.)-এর হৃদয়ে আল্লাহর স্থান ওপরে, নাকি সন্তানের স্থান। যখন তিনি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন, আল্লাহ জান্নাত থেকে দুম্বা পাঠিয়ে ইসমাইল (আ.)-কে রক্ষা করলেন এবং এই ত্যাগের স্মৃতিকে কেয়ামত পর্যন্ত বিশ্ববাসীর জন্য আবশ্যকীয় ইবাদত হিসেবে জারি করে দিলেন।
কুরবানির রক্ত প্রবাহিত করার মূল উদ্দেশ্যই হলো মানুষের ভিতরের লোভ-লালসা ও পশুত্বকে বিসর্জন দেওয়া। আমরা যাপিত জীবনে অনেক সময় নফসের খায়েশ বা রিপুর তাড়নায় আল্লাহর বিধানের ব্যাপারে গাফেল হয়ে যাই। এর ফলে আমরা আল্লাহর ভালোবাসা থেকে দূরে চলে যাই। নিজের কষ্টে উপার্জিত হালাল সম্পদ কুরবানির মাধ্যমে আল্লাহর ভালোবাসা নিজের জীবনে প্রতিফলন পাওয়া যায়। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘আমার নামাজ, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও মরণ সব বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য (সুরা আনআম)।’
তবে অবশ্যই কুররবানি হতে হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহর কাছে তোমাদের কুরবানির পশুর রক্তমাংস কিছুই পৌঁছে না। আল্লাহর কাছে পৌঁছে কেবল তোমাদের তাকওয়া (সুরা হজ)।
সামর্থ্যবান প্রত্যেকের ওপর কুরবানি করা ওয়াজিব। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যারা কুরবানি করবে না তাদের ব্যাপারে রসুল (সা.) বলেছেন, সে যেন ঈদগাহের ধারেকাছেও না আসে (সুনানে ইবনে মাজাহ)।’
ঈদ হলো এমন একটা দিন, যেদিন ধনী-গরিব সবার আনন্দের দিন। এমন দিনে রসুল (সা.) নিষেধ করলেন যার সামর্থ্য আছে, কিন্তু কোরবানি করল না তাকে ঈদগাহেই আসতে। এর থেকে আমরা বুঝতে পারি কুরবানি কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তা ছাড়া কুরবানির সওয়াবও বিপুল। কুরবানির পশুর প্রতিটি লোম ও পশমের বিনিময়ে আল্লাহ সওয়াব দান করেন। তবে সেই কুরবানি হতে হবে লৌকিকতা ও অহংকার প্রদর্শনমুক্ত।
বর্তমান সময়ে কুরবানি এলে আমাদের সমাজে একশ্রেণির মানবিক মানুষের উদ্ভব ঘটে। যারা প্রাণী হত্যার দোহাই দিয়ে কুরবানিকে বর্বরতা হিসেবে আখ্যায়িত করতে চায়। অথচ এই মানুষগুলোর প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় মাংস থাকে। বিশ্বসভ্যতায় খাদ্যশৃঙ্খল ও বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য রক্ষায় পশুপালন ও পশু জবাই একটি স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া। যেটা সব ধর্মের মানুষই করে থাকে। সুতরাং কেবল কুরবানির সময় যাদের হৃদয়ে প্রাণিকুলের জন্য মায়া উতলে ওঠে, তাদের মতলব যে ভিন্ন, তা বুঝতে কারোর বাকি থাকার কথা নয়।
আল্লাহর নৈকট্য লাভের পাশাপাশি কুরবানির প্রভূত ইহজাগতিক উপকারিতাও আছে। বাংলাদেশ সরকারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২ সালে ৯৯ লাখ ৫০ হাজার, ২০২৩ সালে ১ কোটি ১ লাখ এবং ২০২৪ সালে ১ কোটি ৪ লাখের বেশি পশু কুরবানি করা হয়েছে। এই কুরবানিকে কেন্দ্র করে দেশে প্রতি বছর ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি অর্থনৈতিক লেনদেন হয়। এর মাধ্যমে খামারি, পশু ব্যবসায়ী, পরিবহনশ্রমিক, চামড়াশিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাসহ বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল থাকে। কুরবানি না থাকলে এসব খাতের কার্যক্রমের পরিধি অনেকাংশে সীমিত হয়ে যেত।
কুরবানির সবচেয়ে বড় সামাজিক আবেদন হলো দরিদ্রদের এক-দুবেলা গোশত খাওয়ার ব্যবস্থা। আমাদের দেশে এমন অসংখ্য পরিবার আছে, যারা সারা বছরে দুবেলা গরু-ছাগলের গোশত খেতে পারে না। দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে ও তাদের পুষ্টি-আমিষের ঘাটতি মেটাতে প্রতি বছর কুরবানি অভাবনীয় ভূমিকা পালন করে।
আল্লাহর প্রতিটি বিধানের মাঝেই এমন বহুবিধ ফায়দা রয়েছে। মহান আল্লাহ আমাদের তার সব বিধান যথাযথভাবে পালনের তৌফিক দিন।
জুমার মিম্বর থেকে গ্রন্থনা : নুরুল ইসলাম তানঈম
সূত্র : দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন