article

মিসওয়াক সমাজে অবহেলিত সুন্নাহ

৮ আগস্ট, ২০২৬, সকাল ০৯:৫২

শায়খ আহমাদুল্লাহ

মিসওয়াক নবীজি (সা.)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ। নবীজি (সা.) উম্মতকে এমন কিছু অভ্যাস গড়ে তুলতে উৎসাহিত করেছেন, যা একদিকে স্বাস্থ্যসুরক্ষায় সহায়ক, অন্যদিকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনেরও মাধ্যম। মিসওয়াক তেমনই একটি আমল। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, আধুনিকতার ছোঁয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কল্যাণকর এ সুন্নাহটি আজ আমাদের সমাজ থেকে প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে।


বর্তমানে দাঁত পরিষ্কারের ক্ষেত্রে আমরা টুথব্রাশ ও টুথপেস্ট ব্যবহারে অভ্যস্ত। শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে ব্রাশ ব্যবহার সম্পূর্ণ বৈধ। হাদিসে মুখ পরিষ্কার রাখার যে সাধারণ নির্দেশনা এসেছে, ব্রাশ ব্যবহারের মাধ্যমেও তা অর্জিত হয়। তবে মিসওয়াকের নির্দিষ্ট ফজিলত ও এই বিশেষ সুন্নাহ আদায় করতে হলে মিসওয়াকই ব্যবহার করতে হবে। ব্রাশ বা অন্য কোনো উপায়ে মিসওয়াকের বিশেষ সুন্নাহ আদায় হয় না। আর মিসওয়াক আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি বিশেষ আমল। রসুল (সা.) বলেছেন, ‘মিসওয়াক হলো মুখের পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যম এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উপায়।’ (নাসায়ি) চিন্তা করলে বিস্মিত হতে হয়, দুনিয়ার একজন সামান্য ক্ষমতাধর ব্যক্তিকে সন্তুষ্ট করতে মানুষ কত কিছুই না করে, অথচ প্রতিদিন কয়েকবার মিসওয়াকের মতো একটি ছোট্ট আমলের মাধ্যমেই মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা যায়। অথচ এ আমলটুকুও আমরা অবহেলা করি।


রসুল (সা.)-এর জীবনে মিসওয়াকের গুরুত্ব কতখানি ছিল, তা তার জীবনের শেষ মুহূর্তের একটি ঘটনা দিয়ে সহজেই উপলব্ধি করা যায়। জীবনের অন্তিম সময়ে, যখন তিনি চলনশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন এবং কথা বলাও তার জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছিল, তখন তিনি আয়েশা (রা.)-এর ঘরে শায়িত ছিলেন। সে সময় আয়েশা (রা.)-এর ভাই আবদুর রহমান (রা.) ঘরে প্রবেশ করেন। তার হাতে একটি মিসওয়াক ছিল। নবীজি সেটির দিকে ইশারা করলেন। আয়েশা (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কি মিসওয়াক করতে চাইছেন? তিনি ইশারায় সম্মতি জানালেন। তখন আয়েশা (রা.) নবীজিকে মিসওয়াক এনে দিলেন। চিবানোর মতো শক্তি ছিল না নবীজির। আয়েশা (রা.) চিবিয়ে নরম করে দিলেন। আর রসুল (সা.) মিসওয়াক করতে করতেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন। (বুখারি)


এত শত আমল থাকা সত্ত্বেও জীবনের শেষ মুহূর্তে মিসওয়াকের আমলের প্রতি নবীজির আকুলতা থেকে বোঝা যায়, একজন মুমিনের জীবনে মিসওয়াকের আমল কতটা গভীর আধ্যাত্মিক গুরুত্ব বহন করে। অথচ আজ আমাদের থেকে এই আমল হারিয়েই গেছে বলা যায়।


মিসওয়াকের গুরুত্ব আরও একটি হাদিস থেকে বোঝা যায়। আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুল (সা.) বলেছেন, ‘যদি আমার উম্মতের জন্য কষ্টকর না হতো, তবে আমি তাদের প্রত্যেক নামাজের সময় মিসওয়াক করার নির্দেশ দিতাম।’ (বুখারি)


ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি মিসওয়াকের নানা জাগতিক উপকারিতাও রয়েছে। মিসওয়াকের প্রাকৃতিক আঁশ ও কষ দাঁতের এনামেল রক্ষা করে এবং ব্রেন বা মস্তিষ্কের স্নায়ুর সঙ্গেও এর এক গভীর যোগসূত্র রয়েছে। মিসওয়াক করলে মানুষের মানসিক প্রশান্তি বাড়ে এবং ঈমানি চেতনা শানিত হয়। শুধু এটিই নয়, নবীজি (সা.)-এর প্রতিটি সুন্নাহর পেছনেই বহুমুখী উপকারিতা নিহিত রয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞানের বহু গবেষণায় আজ যেগুলোর সুফল প্রমাণিত হচ্ছে, নবীজি (সা.) এগুলো আমাদের বহু আগেই জানিয়ে গেছেন।


দুঃখজনক হলো, আমাদের আমল থেকে নবীজির সুন্নাহ ধীরে ধীরে দূর হয়ে যাচ্ছে। এর অন্যতম কারণ হলো অবহেলা। আজ আমরা সন্তানদের দাঁত ব্রাশ করতে শেখাই, কিন্তু একটি মিসওয়াক সঙ্গে রাখার মাহাত্ম্য শেখাই না। সন্তান যদি তার বাবা-মাকে নিয়মিত সুন্নাহর ওপর আমল করতে দেখত, তবে স্বাভাবিকভাবেই তারাও সুন্নাহর প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠত। মূলত পারিবারিক শিক্ষা থেকেই সুন্নাহ বিস্মৃত হতে চলেছে।


আমাদের জীবনাচার থেকে সুন্নাহর আমল হারিয়ে যাওয়ার আরও কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে প্রথমত, আধুনিকতার নামে আমরা অনেক সময় মনে করি, পুরোনো বা প্রাকৃতিক কোনো পদ্ধতি মানেই তা অনুন্নত বা অবৈজ্ঞানিক। দ্বিতীয়ত, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় অঙ্গনেও সুন্নাহর পর্যাপ্ত চর্চা হয় না। ফলে এ প্রজন্মের অনেকেই জানে না, সুন্নাহ আমল কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তৃতীয়ত, আমরা অনেক সময় ফরজ ও ওয়াজিব পালনের মধ্যেই নিজেদের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রাখি; সুন্নাহর চর্চায় যথেষ্ট গুরুত্ব দিই না।


মোটকথা, মিসওয়াক এমন একটি আমল, যা নবীজি (সা.) অত্যন্ত পছন্দ করতেন। তাই এটি শুধু একটি আমলই নয়; বরং নবীজির প্রতি ভালোবাসা ও ইমানি আবেগেরও এক অনন্য প্রকাশ। আসুন, আত্মিক ও শারীরিক কল্যাণের জন্য এবং নবীজির এই প্রিয় সুন্নাহকে সমাজে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে আজ থেকেই মিসওয়াককে আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী করে নিই।


জুমার মিম্বর থেকে গ্রন্থনা : নুরুল ইসলাম তানঈম

সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন