article

হজের শিক্ষা ও বিশ্বমানবতার দিকনির্দেশনা

২১ এপ্রিল, ২০২৬, দুপুর ১১:৪৮

শায়খ আহমাদুল্লাহ

হজ ইসলামের পাঁচটি মূল স্তম্ভের একটি। এটি শুধু একটি আনুষ্ঠানিক ইবাদত বা বার্ষিক ধর্মীয় জমায়েত নয়; বরং এটি আত্মশুদ্ধি, সাম্য ও বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের অনন্য মিলনমেলা। প্রতি বছর জিলহজ মাসে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখ লাখ মুসলিম পবিত্র মক্কা নগরীতে সমবেত হয়। এ বিশাল সমাবেশ মানব ঐক্যের এক অনন্য প্রতীক। এটি শুধু মুসলিম উম্মাহর জন্য এক আধ্যাত্মিক যাত্রা নয়; বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য অনন্য দিকনির্দেশনা। হজের শিক্ষাগুলো ব্যক্তি, সমাজ ও বিশ্বমানবতার জন্য গভীর তাৎপর্য বহন করে।


একাত্মবাদ ও আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণ


হজের অন্যতম মূল শিক্ষা হলো আল্লাহর একাত্মবাদ প্রতিষ্ঠা ও তার প্রতি সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ। হজের প্রতিটি রুকন শুরু হয় ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ ধ্বনির মাধ্যমে। অর্থাৎ ‘হে আল্লাহ, আমি হাজির।’ এই পবিত্র ধ্বনিতে ফুটে ওঠে একমাত্র আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠতার চেতনা। একজন হাজি ঘোষণা করেন, তিনি আর কারও ডাকে নয়, কেবল আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়েছেন। সমস্ত প্রশংসা, ভালোবাসা, নিয়ামত ও সার্বভৌমত্ব একমাত্র তারই। পৃথিবীর কোনো ক্ষমতা, কোনো বস্তু, কোনো ব্যক্তি তার মালিক নয়।


মানবতা যখন নানান বস্তু, ক্ষমতা বা নিজস্ব কুপ্রবৃত্তিকে উপাস্য বানিয়ে নানান দলে ও উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে, তখন হজের এ শিক্ষা এক আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠতার পথ দেখায়।


আত্মশুদ্ধি ও নৈতিক উন্নয়নের প্রশিক্ষণ


হজ কেবল একটি শারীরিক ও আধ্যাত্মিক যাত্রা নয়; বরং এটি আত্মশুদ্ধি ও নৈতিক উন্নয়নের পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ। হজের সময় একজন হাজিকে বিশেষভাবে অশ্লীল কথা ও কাজ, সব ধরনের পাপাচার, ঝগড়া-বিবাদ থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়।


এ নির্দেশনা শুধু বাহ্যিক আচরণের জন্য নয়; বরং এটি একজন হাজির অন্তর পরিশুদ্ধ করার প্রশিক্ষণ। কয়েক দিনের এ কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমে তিনি ধৈর্য, সহনশীলতা, সংযম ও আত্মনিয়ন্ত্রণের গুণাবলি অর্জন করেন। গরমের প্রচণ্ডতা, ভিড়ের চাপ, দীর্ঘ পথ হাঁটা, খাবারের অভাব, বিশ্রামের সীমাবদ্ধতা সবকিছুর মধ্যেও তিনি নিজের রাগ ও ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করতে শেখেন। এ শিক্ষা ও অনুশীলন কেউ নিজের আজীবনের সম্বল হিসেবে গ্রহণ করলে তিনি একটি দৃঢ় মানসিক কাঠামো লাভ করবেন, যা পরবর্তী জীবনেও তাকে যেকোনো সংকট মোকাবিলায় সাহায্য করবে।


ত্যাগ ও আত্মদানের মহিমা


কুরবানী হজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা ইবরাহিম (আ.) ও তার পরিবারের মহান ত্যাগের অমর স্মৃতি বহন করে। হজের অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা যেমন তাওয়াফ, সাঈ, আরাফাতে অবস্থানের মতো কুরবানী মুমিনের হৃদয়ে আল্লাহর প্রতি নিরঙ্কুশ আনুগত্য ও আত্মসমর্পণের চেতনা জাগ্রত করে। এটি স্মরণ করিয়ে দেয় স্রষ্টার সন্তুষ্টির পথে নিজের প্রিয় বস্তু, অন্তরের কুপ্রবৃত্তি, আমিত্ব, অহংকার বিসর্জন দেওয়াই হলো প্রকৃত ইবাদত। ইবরাহিম (আ.)-এর এই ত্যাগের ইতিহাস আমাদের শেখায় সত্য ও ন্যায়ের পথে চলতে হলে আত্মত্যাগ অপরিহার্য। আজকের এই বস্তুবাদী পৃথিবীতে যেখানে স্বার্থপরতা ও সীমাহীন লোভ মানুষকে অন্যায়ের পথে ধাবিত করছে, সেখানে কুরবানী আমাদের শেখায় ত্যাগের মহিমা। এটি মানুষকে ভোগের মোহ কাটিয়ে আত্মোৎসর্গের মহান আদর্শে উজ্জীবিত হওয়ার অনুপ্রেরণা জোগায়।


ইহরামের সেলাইবিহীন কাপড় : মৃত্যুচেতনার প্রতীক


হজের অন্যতম দৃশ্যমান ও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ প্রতীক হলো ইহরামের দুই টুকরা সেলাইবিহীন কাপড়। এই অতি সাধারণ ও অনাড়ম্বর পোশাকটি যেন পরকালের কাফনের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। এটি একজন হাজিকে স্মরণ করিয়ে দেয় একদিন তাকে দুনিয়ার যাবতীয় জাঁকজমক, পোশাক-পরিচ্ছদ ও কৃত্রিম সামাজিক পরিচয় পেছনে ফেলে নিঃস্ব অবস্থায় আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হতে হবে।


ইহরামের এ শুভ্রতা মানুষের ভিতরকার সব ধরনের আভিজাত্যের অহংকার ও লৌকিক বৈষম্য ধুয়েমুছে দেয়। এখানে রাজা-প্রজা, ধনী-দরিদ্র কিংবা কৃষ্ণাঙ্গ-শ্বেতাঙ্গ বলে কোনো ভেদাভেদ নেই; সবাই একই বেশে, একই সারিতে দাঁড়িয়ে এক অভিন্ন লক্ষ্যে ইবাদত করে। এটি মূলত মানবজাতিকে এ বার্তাই দেয়-স্রষ্টার কাছে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব তার পোশাকে নয়, বরং তার অন্তরের পবিত্রতা ও তাকওয়ার ওপর নির্ভরশীল।


শয়তানের বিরুদ্ধে লড়াই


হজের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ আমল হলো জামারায় বা নির্ধারিত স্তম্ভে পাথর নিক্ষেপ করা। এটি শুধু একটি শারীরিক কর্মকাণ্ড নয়; বরং মানুষের ভিতরের অশুভ শক্তি, কুপ্রবৃত্তি ও শয়তানের নিরন্তর প্ররোচনার বিরুদ্ধে আজীবন সংগ্রামের দৃঢ় অঙ্গীকার।


এ আচারের উৎপত্তি ইবরাহিম (আ.)-এর ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে। যখন তিনি আল্লাহর নির্দেশে নিজের প্রিয় পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে কুরবানী করতে চলেছিলেন, তখন শয়তান তাকে বারবার ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করে। ইবরাহিম (আ.) শয়তানের প্ররোচনা প্রত্যাখ্যান করে পাথর নিক্ষেপ করেন। হজের সময় মুসলমানরা সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে শয়তানের প্রতীকী স্তম্ভে পাথর ছোড়ে। রমির মাধ্যমে একজন হাজি ঘোষণা করেন, তিনি শয়তানের কোনো প্ররোচনা, কুমন্ত্রণা বা বিভ্রান্তি মেনে নেবেন না।


বাস্তব জীবনে এ শিক্ষার প্রয়োগ অপরিসীম। শুধু হজের সময় নয়, সারা জীবন একজন মুমিনকে শয়তানের প্ররোচনা থেকে বাঁচতে সচেষ্ট থাকতে হয়। অন্যায়ের প্রলোভন, মিথ্যা বলা, পরনিন্দা করা, সম্পদের লোভ, ক্ষমতার অপব্যবহার এ সবই শয়তানের কাজ। হজের রমি আমাদের প্রতিদিনের জীবনেও এগুলোর বিরুদ্ধে ‘পাথর নিক্ষেপ’ করার মানসিকতা তৈরি করে দেয়।


ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব


হজের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো মুসলিম জাতির ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব। এটি বৈশ্বিক ঐক্যের এক জীবন্ত মহড়া, যেখানে ধনী-গরিব, সাদা-কালো, আরব-অনারব, রাজা-প্রজা, জাতিবর্ণ, ভাষা বা শ্রেণির বিভেদ নেই। সবাই একই পোশাকে, একই উদ্দেশ্যে, একই কাতারে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করে। ইহরামের দুই টুকরা কাপড় সব ধরনের সামাজিক পদমর্যাদার পার্থক্য মুছে দেয় এবং প্রমাণ করে সামাজিক বৈষম্য কৃত্রিম, সব মানুষের মৌলিক মর্যাদা সমান। হজ বিশ্বমানবতাকে শেখায় আমরা সবাই আদমের সন্তান, একই স্রষ্টার সৃষ্টি এবং পরস্পরের ভাই। বর্তমান বিশ্বের জাতিগত, বর্ণগত ও অর্থনৈতিক বিভাজন, জাতিভেদপ্রথা ও বর্ণবাদের বিরুদ্ধে হজ এক শক্তিশালী বার্তা। বর্তমানে মুসলিমদের শতধাবিভক্তির প্রেক্ষাপটে এ শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।


ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা


হজের প্রতিটি পদক্ষেপে ধৈর্যের পরিচয় দিতে হয়। ইহরাম বাঁধার পরই শুরু হয় ধৈর্যের পরীক্ষা। গরমের প্রচণ্ডতা, দীর্ঘ পথ হাঁটা, বিশ্রাম ও খাবারের সীমিত ব্যবস্থা, লক্ষাধিক মানুষের ভিড়ের মধ্যে তাওয়াফ ও সাঈ সম্পন্ন করা, আরাফাতের মাঠে প্রখর রোদে দাঁড়িয়ে থাকা, মুজদালিফায় খোলা আকাশের নিচে রাত কাটানো, মিনায় কঙ্কর নিক্ষেপের সময় ধাক্কাধাক্কি সহ্য করা সবকিছুই একজন হাজির ধৈর্য, সহনশীলতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের দক্ষতা পরখ করে নেয়। এ কঠিন পরিবেশে অন্যদের সঙ্গে মিলেমিশে চলতে হয়। কারও ধাক্কা খেয়ে রাগ করা, কোনো সুযোগসুবিধার জন্য ঝগড়া করা বা কারও আচরণে বিরক্ত হয়ে উত্তেজিত হওয়া হজের সময় এসব সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বরং ইসলাম শিক্ষা দেয় হজের মধ্যে কোনো অশ্লীলতা, পাপাচার ও ঝগড়া-বিবাদ নেই (সুরা বাকারা, ১৯৭)। ফলে একজন হাজি ধৈর্যের চর্চার মাধ্যমে নিজের আবেগ ও মেজাজ বশে আনতে শেখেন। তিনি বুঝতে পারেন ধৈর্য কেবল নিষ্ক্রিয় সহিষ্ণুতা নয়; বরং এটি সক্রিয় আত্মনিয়ন্ত্রণ, যা তাকে সঠিক সিদ্ধান্ত ও সৎকর্মে অটল রাখে।


বস্তুত হজ শুধু মুসলমানদের একটি ধর্মীয় কর্তব্য নয়; এটি মানবজাতির জন্য সর্বজনীন দিকনির্দেশনা। হজ আমাদের শান্তি, সাম্য, ঐক্য, ত্যাগ, ধৈর্য ও মানবপ্রেমের শিক্ষা দেয়। আজকের বিভক্ত ও সংঘাতময় পৃথিবীতে হজের বাণী যেন মরুভূমিতে উদ্যানের মতো। যদি বিশ্ববাসী হজের শিক্ষাগুলো অন্তরে ধারণ করে, তবে পৃথিবী আরও শান্তিময়, সুন্দর ও বাসযোগ্য হয়ে উঠবে।


হজ আমাদের মনে করিয়ে দেয় মানুষের প্রকৃত মর্যাদা তার তাকওয়ায়, আর প্রকৃত সফলতা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে। হজের এই আধ্যাত্মিক চেতনা ও মানবিক মূল্যবোধই হতে পারে আগামীর বিশ্বের জন্য কল্যাণের এক চিরন্তন আলোকবর্তিকা।


সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন