ঝড়বৃষ্টির সময় করণীয়
২ মে, ২০২৬, দুপুর ১০:৫৯
শায়খ আহমাদুল্লাহ
বৃষ্টি মহান আল্লাহর নেয়ামত। এ নেয়ামতে শুধু মানুষ নয়, পশুপাখিও সিক্ত হয়। বৃষ্টির ফলে আমাদের দেহমন শীতল হয়। সজীব হয়ে ওঠে ফসলের মাঠ ও আমাদের চারপাশ। এ বৃষ্টি থেকেই আমাদের জীবিকার ব্যবস্থা হয়।
মহান আল্লাহ আমাদের অনুগ্রহ করে বৃষ্টি দান করেন। অন্যথায় আকাশ থেকে বৃষ্টি নামানোর সাধ্য কারোর নেই। আল্লাহ বলেন, তোমরা যে পানি পান কর সেই সম্পর্কে তোমরা ভেবে দেখেছ কি? তা কি তোমরাই মেঘ থেকে বর্ষণ কর, নাকি আমিই তা বর্ষণ করি? (সুরা ওয়াকিয়া)
বৃষ্টি যদিও আল্লাহর রহমত হয়ে আসে। কিন্তু এর আড়ালে আল্লাহর আজাবও লুকিয়ে থাকতে পারে। পূর্ববর্তী কোনো কোনো জাতির ওপর বৃষ্টি আজাব হয়েও এসেছিল।রাসুল (সা.) যখন মেঘ বা ঝড়ো হাওয়া দেখতেন, তখন তার চেহারায় আশঙ্কার ছাপ ফুটে উঠত। আয়েশা (রা.) বলেন, আমি জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহর রাসুল, আমি দেখতে পাই, লোকেরা মেঘ দেখে খুশি হয়। আর আপনাকে দেখি, যখন আপনি মেঘ দেখেন, তখন আপনার চেহরায় আশঙ্কার ছাপ পরিলক্ষিত হয়। নবীজি (সা.) বলেন, হে আয়েশা, আমি এর মধ্যে আজাব না থাকার ব্যাপারে নিশ্চিত নই। একটি জাতিকে ঝড়ো হাওয়া দ্বারা আজাব দেওয়া হয়েছে। আরেক জাতি আসমানি আজাব দেখে বলেছিল, এ তো মেঘ, যা আমাদের ওপর বৃষ্টি বর্ষণ করবে (মুসলিম)।
তাই বৃষ্টির সময় উচিত হলো আল্লাহর কৃতজ্ঞতায় সমর্পিত হওয়া এবং আজাব থেকে পানাহ চাওয়া। পাশাপাশি বৃষ্টির সময়ে প্রিয়নবী (সা.)-এর কিছু সুন্নাহও রয়েছে সেই সুন্নাহগুলো পালন করা।
ঝড় বৃষ্টির সময় পালনীয় সুন্নাহ
এক. সতর্কতা অবলম্বন করা : বৃষ্টির সময় কখনো কখনো প্রবল বাতাস প্রবাহিত হয়। এ কারণে বৃষ্টির সময় প্রবাহিত হওয়া ঝোড়ো বাতাস ও এর ক্ষয়ক্ষতি থেকে সতর্কতা অবলম্বন জরুরি। যে কোনো দূর্যোগ-দুর্বিপাকে সাধ্য অনুযায়ী সতর্ক থাকা ইসলামের নির্দেশ।
দুই. দোয়া পাঠ করা : যখন বৃষ্টি নামে, তখন দোয়া পাঠ করা সুন্নাহ। রাসুল (সা.) যখন বৃষ্টি দেখতেন, তখন তিনি আল্লাহর কাছে এই বলে দোয়া করতেন যে, হে আল্লাহ, আপনি বৃষ্টিকে উপকারী বৃষ্টি বানান (বুখারি)। তাছাড়া বৃষ্টির সময় দোয়া কবুলও হয়। দুই সময়ের দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। (এক.) আজানের সময়ের দোয়া। (দুই.) বৃষ্টির সময়ের দোয়া (জামিয়ুস সগির)।
তিন. অতিবৃষ্টি দেখা দিলে বিশেষ দোয়া পাঠ করা : যখন অতিবৃষ্টি দেখা দেয় এবং এর ফলে ফসল ইত্যাদির ক্ষতি হয়, তখনও দোয়া পাঠ করা সুন্নাহ। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, একদিন জুমার দিনে রাসুল (সা.) খুতবা দিচ্ছিলেন। এমন সময় এক ব্যক্তি মসজিদে প্রবেশ করে নবীজির সামনে দাঁড়িয়ে বলল, সম্পদ বিনষ্ট হয়ে গেল এবং রাস্তাঘাট বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। অতএব আপনি আল্লাহর কাছে বৃষ্টি বন্ধের জন্য দোয়া করুন। তখন রাসুল (সা.) দুই হাত তুলে দোয়া করলেন, হে আল্লাহ, আমাদের ওপর নয়; বরং আমাদের আশেপাশে বৃষ্টি বর্ষণ করুন। টিলা, পাহাড়, ঝোপঝাড়, মালভূমি, উপত্যকা ও বনভূমিতে বর্ষণ করুন (বুখারি)।
চার. বৃষ্টিকে আল্লাহর রহমত বলে অভিহিত করা : যখন বৃষ্টি বর্ষিত হয়, তখন বৃষ্টিকে মহান আল্লাহর রহমত হিসাবে অভিহিত করা সুন্নাহ। আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) যখন বৃষ্টি দেখতেন, তখন বলতেন, এ তো আল্লাহর রহমত (মুসলিম)।
পাঁচ. বৃষ্টি-বাদল সংক্রান্ত কুসংস্কার বর্জন করা এবং বৃষ্টিকে একমাত্র আল্লাহর অনুগ্রহ মনে করা : একমাত্র আল্লাহর অনুগ্রহেই মানুষ বৃষ্টি লাভ করে। বৃষ্টি বর্ষণের পেছনে আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো শক্তি যেমন তারকা, নক্ষত্র ইত্যাদির কোনো হাত নেই। বরং তারকা ও নক্ষত্র-সহ মহাবিশ্বের সকল শক্তি মহান আল্লাহর সৃষ্টি ও ক্ষমতাধীন। তাই সকল কুসংস্কার ও অবান্তর বিশ্বাসকে বর্জন করে বৃষ্টিকে একমাত্র আল্লাহর অনুগ্রহ মনে করাই মুমিনের চরিত্র। জায়েদ ইবনে খালিদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা হুদাইবিয়ার বছর নবীজির সঙ্গে বের হলাম। এক রাতে খুব বৃষ্টি হলো। নবীজি (সা.) আমাদের নিয়ে ফজরের সালাত আদায় করলেন। এরপরে আমাদের দিকে ফিরে বললেন, ‘তোমরা জান কি তোমাদের রব কী বলেছেন? আমরা বললাম, আল্লাহ ও তার রাসূলই ভালো জানেন। তখন তিনি বললেন, আল্লাহ বলেছেন, আমার বান্দাদের মধ্য কেউ আমার প্রতি বিশ্বাসী হয়েছে আর কেউ হয়েছে আমার প্রতি অবিশ্বাসী। যে বলেছে, আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমতে আমরা বৃষ্টি লাভ করেছি, সে আমার প্রতি বিশ্বাসী এবং নক্ষত্রের প্রতি অবিশ্বাসী। আর যে বলেছে, অমুক অমুক নক্ষত্রের প্রভাবে আমরা বৃষ্টি লাভ করেছি, সে আমার প্রতি অবিশ্বাসী এবং নক্ষত্রের প্রতি বিশ্বাসী (বুখারি)।
ছয়. বৃষ্টির পানি গায়ে লাগানো : শরীরে বৃষ্টির পানি লাগানো সুন্নাহ। রাসুল (সা.) এমনটি করতেন (মুসলিম)।মহান আল্লাহ আমাদের সুন্নাহসম্মত জীবনযাপন করার তাওফিক দিন।
জুমার মিম্বর থেকে গ্রন্থনা : নুরুল ইসলাম তানঈম
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন