ভালো লেখার প্রয়োজন কখনো ফুরাবে না : শায়খ আহমাদুল্লাহ
২৫ অক্টোবর, ২০২৬, দুপুর ০৩:৪১
বহুমুখি কাজের মাধ্যমে গোটা জাতির কাছে পরিচিত মুখ শায়খ আহমাদুল্লাহ। তবে তাঁর সত্তাজুড়ে রয়েছে লেখালেখি। একটা সময় নিয়ম করে লিখতেন। করেছেন প্রচুর অনুবাদও। প্রয়োজনীয় বিভিন্ন বিষয়ে রয়েছে তাঁর বই-পুস্তিকা। নানা ব্যস্ততার কারণে লেখালেখিতে কিছুটা ভাটা এলেও এই জগতের প্রতি তাঁর বরাবরই অন্যরকম টান রয়েছে। নতুন করে তিনি লেখালেখিতে নিয়মিত হওয়ার চেষ্টা করছেন। লেখালেখির নানা দিক নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন : জহির উদ্দিন বাবর
একটা সময় আপনি প্রচুর লিখতেন, অনুবাদ করতেন। সেই সময়টা এখন কতটা মিস করেন?
লেখালেখি দাওয়ার অন্যতম প্রভাবশালী মাধ্যম। বহুমুখি দাওয়ার অংশ হিসাবে আমি উম্মারহর প্রয়োজন ও উপকারী বিষয়ে লেখালেখি করি। এখনো লিখে চলেছি। তবে একটা সময় নিয়মিত লিখতাম, অনুবাদ করতাম। তখন সময়ের বড় একটা অংশ এ কাজে ব্যয় করার সুযোগ ছিল। এখন বহুমুখি দাওয়াহ, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাজের ব্যস্ততা বেড়েছে। ফলে আগের মতো নিয়মিত লেখা হয় না। তবে লেখার প্রতি আগ্রহ কখনো কমেনি। সুযোগ পেলেই লিখতে বসি এবং প্রচুর লেখার প্রয়োজনও অনুভব করি। ভালো লেখা মানুষের চিন্তা ও জীবনকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করতে পারে।
এখন পর্যন্ত আপনার কয়টি বই প্রকাশিত হয়েছে? উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বইয়ের নাম বলবেন কি?
বইয়ের সংখ্যা হিসাব করতে গেলে বই, পুস্তিকা ও বিভিন্ন বিশেষায়িত প্রকাশনা—এগুলো আলাদা করে দেখতে হয়। আমার বেশ কিছু বই ও পুস্তিকা প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে ঈমানের অপরিহার্য পাঠ, উমরাহ কীভাবে করবেন, তারাবীহর সালাতে কুরআনের বার্তা, মাহে রমাদানের ২৭ আমল, রমাদান প্ল্যানার, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সকাল-সন্ধ্যার দুআ ও যিকর উল্লেখযোগ্য। সম্প্রতি ঘুমের আগের দুআ-যিকির ও আমল নিয়েও একটি পুস্তিকা প্রকাশিত হয়েছে। আমার সব সময়ই চেষ্টা থাকে, সাধারণ মানুষের প্রয়োজন, কিন্তু যেসব বিষয়ে এখনো তেমন ভালো কাজ হয়নি, সেসব বিষয়ে কাজ করা।
সম্প্রতি আপনি প্রয়োজনীয় কিছু বিষয়ে লেখালেখি করছেন। এটাকে সিরিয়াসভাবে নেওয়ার কোনো চিন্তা আছে কি? পাঠকরা আপনার লেখা নিয়মিত পাবে কি?
ইনশাআল্লাহ, ইচ্ছা আছে। লেখালেখির মাধ্যমে মানুষের কাছে কিছু কথা পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজন আমি আগের চেয়ে আরও বেশি অনুভব করছি। বিশেষ করে এমন কিছু বিষয় আছে, যেগুলো নিয়ে আমাদের সমাজে কথা বলা দরকার, কিন্তু সেগুলো নিয়ে খুব বেশি লেখা হয় না, কথা হয় না। সেসব বিষয়ে সময়-সুযোগ অনুযায়ী নিয়মিত লেখার চেষ্টা করব। তবে লেখার জন্য লেখা নয়, যে বিষয়ে বলার মতো কিছু আছে, মানুষের উপকার হবে এবং সময়ের প্রয়োজন আছে, সেসব বিষয়েই লিখতে চাই।
দেশে-বিদেশে আপনার প্রচুর ফ্যান-ফলোয়ার আছেন। তাদের মধ্যে সুস্থ ধারার সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশে আপনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। এ ব্যাপারে কোনো ভাবনা আছে কি?
মানুষের ভালোবাসা যেমন আনন্দের, তেমনি এটি একটি বড় দায়িত্বও। যারা আমাকে ভালোবাসেন বা আমার কথা অনুসরণ করেন, তাদের মধ্যে ভালো চিন্তা, পাঠাভ্যাস, জ্ঞানচর্চা ও সুস্থ সাংস্কৃতিক রুচি যেন গড়ে ওঠে—এটা অবশ্যই কাম্য। ইসলাম মানুষের জীবনকে শুধু ইবাদতের কিছু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং তার চিন্তা, রুচি, আচরণ ও সংস্কৃতিকেও সুন্দর করতে চেয়েছে।
আমাদের এমন সাহিত্য ও সংস্কৃতি দরকার, যা মানুষকে অশ্লীলতা বা হতাশার দিকে ঠেলে দেবে না; বরং তার মধ্যে সৌন্দর্যবোধ, মানবিকতা, নৈতিকতা ও সত্যের প্রতি ভালোবাসা তৈরি করবে। এ ক্ষেত্রে আমরা ব্যাপকভাবে কাজ করতে চাই। ইতোমধ্যে সাধ্যমতো কাজ শুরুও করেছি।
জেনে থাকবেন, আমাদের নির্মাণাধীন মসজিদ কমপ্লেক্সের প্রায় ৫০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। আমরা চাই, এই মসজিদ কমপ্লেক্সকে শুধু নামাজের স্থান হিসেবে নয়, মুসলিম সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চার একটি প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে। এর মাধ্যমে সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতার একটি সুস্থ পরিবেশ তৈরি করতে চাই। ইনশাআল্লাহ, ভবিষ্যতে এ জায়গা থেকে মুসলিম সংস্কৃতির বিকাশ ও প্রসারে ব্যাপক কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রযুক্তির এই উৎকর্ষের যুগে দাওয়াতের ক্ষেত্রে একটি লেখা বা একজন লেখকের ভূমিকা কতটুকু?
প্রযুক্তি এখন মানুষের জন্য খুব সহজলভ্য। একটি পরিবারের প্রায় সবার হাতেই প্রযুক্তি পৌঁছে গেছে। কিন্তু এই সহজলভ্যতার কারণে অনেক ভুল তথ্য ও ভুল লেখা দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। ফলে মানুষ অনেক সময় বিভ্রান্ত হচ্ছে, প্রতারিতও হচ্ছে। তথ্যের এই অতিবৃদ্ধির সময়ে ভালো ও নির্ভরযোগ্য লেখকের প্রয়োজন আমি মনে করি আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়ে গেছে। নিঃসন্দেহে মানুষ এখন লেখার চেয়ে রিলস ও ভিডিওর প্রতি বেশি আকৃষ্ট। কিন্তু ভালো লেখার প্রয়োজন কখনো ফুরাবে না। দাওয়াহর ক্ষেত্রে ভিডিও, অডিও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবকিছুরই প্রয়োজন আছে; একই সঙ্গে মানসম্মত লেখারও নিজস্ব একটি শক্তি ও গুরুত্ব রয়েছে।
এই সময়ে ইসলামি ধারার যারা লেখালেখি করছেন, তাদের লেখায় কোন কোন ঘাটতি চোখে পড়েছে? আপনার বিশ্লেষণ কী?
অনেকেই আন্তরিকতার সঙ্গে ভালো লিখছেন, মাশাআল্লাহ। তবে কিছু জায়গায় আরও উন্নতির সুযোগ আছে। একটি বিষয় আমি বিশেষভাবে বলতে চাই—আমাদের শুধু প্রতিক্রিয়াশীল লেখক হলে চলবে না। সমাজে কোনো ঘটনা ঘটার পর তার প্রতিক্রিয়ায় লেখা যেমন প্রয়োজন, তেমনি মানুষকে আগে থেকেই সঠিক চিন্তা ও মূল্যবোধের দিকে পরিচালিত করার মতো মৌলিক লেখাও প্রয়োজন। আমাদের লেখালেখিকে আরও গবেষণামুখী, বাস্তবমুখী ও দীর্ঘমেয়াদি করতে হবে।
আপনার নেতৃত্বে আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন থেকে অনেক কাজ হচ্ছে মাশাআল্লাহ। লেখালেখি, সাংবাদিক বা মিডিয়া নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো চিন্তা আপনার আছে কি?
আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের কাজের পরিধি—শিক্ষা, সেবা ও দাওয়াহ। বিভিন্ন ক্ষেত্রে আরো বিস্তৃত। লেখালেখি, গবেষণা ও গণমাধ্যমও দাওয়াহর গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই এ ক্ষেত্রগুলো নিয়ে অবশ্যই আমাদের চিন্তা আছে। তবে এটাও মনে রাখা জরুরি, একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে একসঙ্গে সমাজের সব সমস্যা নিয়ে কাজ করা সম্ভব নয়। একসঙ্গে সব দিকে কাজ শুরু করলে কোনো কাজই হয়তো প্রত্যাশিত মানে করা সম্ভব হবে না। তবে একটি ভালো ও বস্তুনিষ্ঠ মিডিয়ার প্রয়োজন আমরা খুব গভীরভাবে অনুভব করি।
লেখক-চিন্তকদের একটি বড় অংশ আপনাকে ফলো করেন। তাদের উদ্দেশে আপনার বিশেষ কোনো বার্তা আছে কি?
লেখক ও চিন্তকদের প্রতি আমার প্রথম কথা হলো, নিজেদের দায়িত্বটা বুঝুন। লেখকের কলম শুধু নিজের কথা বলার মাধ্যম নয়; এটি অনেক মানুষের চিন্তা তৈরির মাধ্যম। তাই লেখার আগে নিজেকে প্রশ্ন করা দরকার—আমি যা লিখছি, তা কি সত্য? এটি কি প্রয়োজনীয়? এটি কি মানুষের কোনো উপকার করবে? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, জনপ্রিয় হওয়ার চেয়ে সত্য ও কল্যাণের পক্ষে থাকা। পাঠক আজ বেশি, কাল কম, এটি খুব বড় বিষয় নয়। একজন লেখক যদি এমন কিছু রেখে যেতে পারেন, যা বহু বছর পরও মানুষকে সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে, সেটিই তার বড় সাফল্য।
সূত্র : লেখকপত্র